যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের (ডিওজে) ফাঁস করা ইমেইল ও ডকুমেন্টের বরাত দিয়ে একাধিক দেশের গণমাধ্যম যখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) লজিস্টিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের ‘এপস্টাইন’ ও ‘ইসরায়েল’ সংযোগ প্রকাশ করছে, ঠিক তখন দফায় দফায় আন্দোলন ও বহুমুখী বিরোধিতার মুখেও চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) তাদের ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার।
এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দুইবার সাক্ষাৎ করা ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী (সিইও) সুলতান আহমেদ বিন সুলাইমের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে কুখ্যাতি পাওয়া প্রয়াত যৌন নিপীড়ক জেফ্রি এডওয়ার্ড এপস্টাইনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। এপস্টাইন তাকে শক্তিশালী বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং ইসরায়েল-ইউএই সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে তাঁকেই ব্যবহার করেছিলেন বলেও একাধিক সংবাদে উল্লেখ রয়েছে।
এপস্টাইনের মধ্যস্থতায় তৈরি হওয়া ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের সঙ্গে বিন সুলাইমের ঘনিষ্ঠতাও প্রকাশ্যে এসেছে। বিভিন্ন মহাদেশের ৮৩টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ডিপি ওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সমুদ্র বন্দর ও দুবাইয়ের মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলটি যে বহু বছর ধরে অস্ত্র সরবরাহ, চোরাচালান ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, এপস্টাইন ফাইলসের সূত্র ধরে তা উন্মোচন করছে গণমাধ্যমগুলো।
এমন একটি সময়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে শুধু চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনা নয়, কক্সবাজারে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠারও সুযোগ দিচ্ছে বাংলাদেশ। যে কারণে প্রতিষ্ঠানটির সাথে এপস্টাইন নেটওয়ার্ক ও ইসরায়েলের সংযোগ সম্পর্কে প্রফেসর ইউনূসের বোঝাপড়া জানার চেষ্টা করেছে ‘ঢাকা স্ট্রিট জার্নাল’ (ডিএসজে)। একই সঙ্গে এপস্টাইন ফাইলসের কমপক্ষে ১৩টি নথিতে মুহাম্মদ ইউনূসের কথা উল্লেখ থাকার বিষয়েও প্রশ্ন করা হয়েছে।
জবাবে তাঁর প্রেস সচিব শফিকুল আলম ডিএসজে প্রতিবেদককে জানান, নির্বাচনের আগে এসব বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করবে না প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়। “ইলেকশনের আগে আমরা এই বিষয় নিয়ে কোনো কথাই বলছি না। ইলেকশন হোক, তারপর আমরা অনেক কিছু…।” তবে এসব বিষয় নিয়ে যে প্রচারণা চলছে, তা নজরে আসার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এই কর্মকর্তা। অনেক ‘ফালতু’ তথ্য ছড়ানো হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।

ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রাথমিক আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিল ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকাকালেই ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দুই পক্ষ একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছিল। বর্তমান সরকার গত বছর এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তোড়জোড় শুরুর পরপরই চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করেন বাংলাদেশ ইয়ুথ ইকোনমিস্টস ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসেন।
প্রাথমিক শুনানি শেষে গত বছরের ৩০ জুলাই হাইকোর্ট রুল জারি করে। পরবর্তীতে ৪ ডিসেম্বর দুই বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ বিভক্ত রায় দেয়। এরপর গত বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) হাইকোর্টের একটি একক বেঞ্চ রিটটি খারিজ করে দেয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) একক বেঞ্চের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিল গ্রহণ করেছেন সুপ্রিম কোর্ট। অর্থাৎ বিষয়টি পুনরায় বিচারাধীন (সাব জুডিস) হয়ে পড়ায়, আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত এনসিটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে পারবে না সরকার।
অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে আসা বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা গত শনিবার (৩১ জানুয়ারি) থেকে সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত প্রতিদিন আট ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করেছেন। পরবর্তীতে আন্দোলনকারীদের মোর্চা ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর সমন্বয়ক এবং জাতীয়তাবাদী বন্দর শ্রমিক দলের নেতা চট্টগ্রাম বন্দরের অডিট সহকারী মো. হুমায়ুন কবির ও ইঞ্জিন ড্রাইভার মো. ইব্রাহিম খোকনসহ প্রতিবাদে জড়িত ১৬ কর্মচারীকে প্রথমে ঢাকার পানগাঁও টার্মিনালে এবং পরবর্তীতে খুলনার মোংলা ও বরগুনার পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে মোর্চাটি মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করেছে এবং বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক মো. হুমায়ুন কবির ডিএসজে প্রতিবেদককে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বলেন, “কার্যত আজ থেকেই অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু হয়ে গিয়েছে।”
হুমায়ুন বলেন, “আমরা মূলত ৫ আগস্টের পর থেকেই আন্দোলন করে আসছি। কারণ ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি ইজারা দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটা হাসিনার আমলেই শুরু হয়েছিল। তখন নানা ভয়-ভীতির কারণে আমরা আন্দোলন করতে পারিনি। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার বিগত সরকারের যাবতীয় পরিকল্পনা ও প্রকল্প বাতিল করেছে। শুধুমাত্র চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের ইজারা দেওয়ার এই প্রজেক্ট তারা বাতিল তো করেইনি, অধিকন্তু দোর্দণ্ড প্রতাপে এটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এ কারণেই আমরা ভীত হয়ে পড়ি। আমাদের মনে হয়, এখন আন্দোলন করা দরকার।”
“আন্দোলন শুরুর পর আমরা দেখলাম ড. ইউনূসের বিশেষ দূত, বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা, নৌপরিবহন উপদেষ্টা, আমাদের বন্দরের চেয়ারম্যান—তাঁরা সকল ফ্যাসিজমকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন। এমনকি তাঁরা আদালতকে পর্যন্ত প্রভাবিত করছেন। যে কারণে আমাদের আসলে আন্দোলন করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর ছিল না,” মুঠোফোনে বলছিলেন এই সংগঠক। তিনি আরও বলেন, “আমাদের এই আন্দোলন আসলে দেশের জন্য; আমাদের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থে নয়।”
তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক সাংবাদিকদের বলেছেন, রমজানের আগে এ ধরনের কর্মসূচি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শ্রমিক-কর্মচারীরা কর্মবিরতি প্রত্যাহার না করলে প্রশাসন আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে বলেও জানান তিনি। “এনসিটি চুক্তি সরকারের সিদ্ধান্ত। সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, সিপিএ তা বাস্তবায়ন করবে,” বলেও মন্তব্য করেন এই কর্মকর্তা। সিপিএ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের কবে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে সংবাদ সম্মেলনে তা জানাতে পারেননি তিনি। তবে বিষয়টি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারে বলে উল্লেখ করেছেন।
ডিপি ওয়ার্ল্ড: বিনিয়োগকারী, নাকি ফাঁদ?
এদিকে, ডিপি ওয়ার্ল্ডে ইসরায়েলের প্রভাব এবং তাদের ভূরাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নজরে রাখার কথা জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের হুমায়ুন কবির। ডিএসজে প্রতিবেদককে তিনি বলেন, “আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড আফ্রিকার দেশগুলোতে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। সেখানকার দেশে দেশে যুদ্ধবিগ্রহ লাগানোর পেছনে তারা বড় শক্তি। তাদের একটি ইসরায়েলি কানেকশন তো অবশ্যই আছে এবং ইসরায়েলের সাথে আবার ভারতীয় একটা কানেকশনও আছে।”
“মনে করে দেখুন, এনসিটি বিদেশি অপারেটরকে দেওয়ার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য বিশ্বব্যাংকের আইএফসি (ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশন) নামের যে প্রতিষ্ঠানকে তারা (সিপিএ) এনেছিল, তাদের কর্মকর্তাদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ ছিল ভারতীয় নাগরিক,” বলেন তিনি।
হুমায়ুন দাবি করেন, “সবকিছু মিলিয়ে ভারত আমাদের শক্ত প্রতিপক্ষ, শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। মোদ্দাকথা হচ্ছে, তারা বন্ধু দেশ নয়; বরং আমাদের শোষণ করতে চায়। এই সমস্ত দেশ এসবের পেছনে জড়িত আছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডেরও বেশিরভাগ কার্যক্রম চালায় ভারতীয় লোকজন।”
ডিপি ওয়ার্ল্ডের ওয়েবসাইটে জানানো হয়েছে, সেখানে ১৬৫টিরও বেশি জাতীয়তার ১,১৯,০০০-এর বেশি কর্মচারী রয়েছেন। সেখানে ভারতীয় কর্মীদের সংখ্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে ভারতে তাদের প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন কেন্দ্রগুলোতে দ্রুত কর্মী নিয়োগ বেড়েছে। ২০২১ সালে তাদের মাত্র ৫০ জন কর্মী ছিল, যা ২০২২ সালের শেষে ৪৫০ জনে পৌঁছায়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ৭০০ জনে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু ও গুরগাঁওয়ের এসব কেন্দ্র মূলত সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, সাপ্লাই চেইন ডিজিটালাইজেশন, প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট, কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স ও অটোমেশনের মতো বিভিন্ন কাজ করে।
জাতীয়তাবাদী বন্দর শ্রমিক দলের নেতা হুমায়ুন ডিএসজে প্রতিবেদককে আরও বলেন, “জিবুতি, সোমালিয়া, ভিয়েতনাম—এই দেশগুলো ইতিমধ্যে তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে। সাথে সাথে তারা শত শত কোটি ডলার দাবি করেছে। তাদের উদ্দেশ্যই থাকে মূলত ব্ল্যাকমেল করা। এই বিষয়গুলোও আমরা বিবেচনায় রাখছি। অর্থাৎ এ সমস্ত কারণেই আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছি।”
২০১৮ সালে জিবুতি সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে দোরালে কনটেইনার টার্মিনালের চুক্তি বাতিল করলে কোম্পানিটি আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে যায়। পরবর্তীতে ২০২২ সালে লন্ডন সালিশি আদালত জিবুতিকে ২০০ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করে, যা মার্কিন আদালতও কার্যকর করে। যদিও ২০২৫ সালে লন্ডনের একই আদালত প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের দাবি খারিজ করে চুক্তি বাতিলকে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌম সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করে।
একই সময়ে সোমালিয়ার ফেডারেল সরকার বারবারা বন্দরের ডিপি ওয়ার্ল্ড চুক্তি বাতিল করে। তবে ১৯৯১ সাল থেকে কার্যত স্বাধীনভাবে পরিচালিত সোমালিল্যান্ড সেই চুক্তি বহাল রাখে এবং ইথিওপিয়ার সঙ্গে অংশীদারিত্বে বন্দরের উন্নয়ন চালিয়ে যায়। ফলে ফেডারেল সরকারের বিরোধিতা সত্ত্বেও ডিপি ওয়ার্ল্ড সেখানে কার্যক্রম অব্যাহত রাখে।
যার ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর ইসরায়েল প্রথম দেশ হিসেবে সোমালিল্যান্ড প্রজাতন্ত্রকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যার কিছুদিন আগে, অক্টোবর মাসে এক সম্মেলনে সেখানকার বারবারা বন্দরে কোম্পানির শত শত মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের কথা তুলে ধরে এই দেশকে স্বীকৃতির পক্ষে যুক্তি দেন ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রধান।
সোমালিল্যান্ডে এই কৌশলগত পদক্ষেপ তেল আবিব ও আবুধাবির গভীরতর সম্পর্কের আরেকটি অধ্যায় বলে ১৫ জানুয়ারি প্রকাশিত এক সংবাদে উল্লেখ করেছে মার্কিন অনুসন্ধানী গণমাধ্যম ‘ড্রপসাইট নিউজ’। তারা জানিয়েছে, ইসরায়েলের এই পদক্ষেপ সোমালিয়ার সরকারকে ক্ষুব্ধ করে তোলে এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন ও আরব লীগের নিন্দা কুড়ায়। তবে তারা সোমালিল্যান্ডকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে ইউএই-এর বারবারা লজিস্টিক হাব আরও শক্তিশালী হয়।
ইসরায়েল ইতিমধ্যেই সেখানে একটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করছে। লোহিত সাগরে নিজেদের জাহাজগুলো ইয়েমেনের হুথি সরকারের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করবে এই ঘাঁটি—এমনই ভাষ্য তাদের। তারা ঠিক তখন সোমালিল্যান্ডের হারগেইসার সরকারকে শক্তিশালী করতে এগিয়ে এসেছে, ইউএই যখন সুদানে গণহত্যাকারী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।
ড্রপসাইট লিখেছে, “গত এক দশকে ইউএই আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের জন্য উচ্চাভিলাষী সব পদক্ষেপ নিয়েছে। যার আওতা তাদের নিজস্ব উপকূল থেকে শুরু করে আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল এবং আরও বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত। তারা বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে লোহিত সাগর নিয়ন্ত্রণে।” তারা আরও লিখেছে, “ইউএই শিখে গেছে কীভাবে নিজের সীমিত শক্তির বাইরে গিয়ে প্রভাব বিস্তার করতে হয়—বিশেষ করে ওয়াশিংটনে বৈশ্বিক অভিজাতদের সমর্থন অর্জনের মাধ্যমে, আবার ইসরায়েলের সঙ্গে গভীরতর কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলে।”
১৯৮০-এর দশক থেকে ইউএই বিশ্বজুড়ে রত্ন, খনিজ, ধাতু এবং চোরাচালান পণ্যের একটি প্রধান ট্রানজিট হাবে পরিণত হয়। একসময় নিস্তব্ধ আমিরাত, যা মাছ ধরা ও মুক্তো আহরণের জন্য পরিচিত ছিল, সেই দশকে রূপ নেয় আন্তঃদেশীয় পুঁজির কেন্দ্রে—যার উৎস ছিল অস্ত্র পাচার, হীরা চোরাচালান এবং অর্থপাচার।
এই রূপান্তরের কেন্দ্রে ছিল ব্যাংক অব ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স ইন্টারন্যাশনাল (বিসিসিআই), যা আবুধাবির শাসক শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ানের অর্থে প্রসারিত হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি গোয়েন্দা সংস্থা ও সংগঠিত অপরাধচক্রগুলোর পছন্দের আর্থিক মাধ্যম হিসেবে পরিচিতি পায়। এর মধ্যে একটি ছিল গোপন অস্ত্র ও কোকেন পাচারের চক্র; যার সঙ্গে এপস্টাইন ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী যুক্ত ছিলেন বলে জানিয়েছে ড্রপসাইট নিউজ।
বিসিসিআই উত্থানের সময়, যখন ইউএই-তে দ্রুত বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রবাহিত হচ্ছিল, বিন সুলাইম দুবাইয়ের শিপিং ও লজিস্টিক অবকাঠামো উন্নয়নে নেতৃত্ব দেন। ১৯৮৫ সালে তিনি জেবেল আলি ফ্রি জোন অ্যাসোসিয়েশনের (জাফজা) চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। এটি ছিল দুবাইয়ের প্রধান সমুদ্র ও বিমানবন্দরের সঙ্গে যুক্ত একটি শিল্পাঞ্চল, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো জাহাজ বা বিমানে পণ্য আমদানি, সংরক্ষণ ও পুনঃরপ্তানি করতে পারত, শুল্ক ছাড়াই।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রতিষ্ঠিত এই অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যমটি আরও জানায়, ইউএই-এর ফ্রি জোনগুলো জাতিসংঘে কার্গো তথ্য রিপোর্ট করত না। তাই এগুলো আফ্রিকার সঙ্গে অবৈধ পণ্য পরিবহনের জনপ্রিয় ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়। দুবাই ফ্রি জোন থেকে তামাক চোরাচালান করে জিবুতি বন্দরে আনা হতো। সেখান থেকে আফ্রিকা জুড়ে বিতরণ করা হতো। একইভাবে প্রায়ই ইউএই থেকে জিবুতিতে অস্ত্রও পাঠানো হতো। মূলত জাল সনদপত্রের আড়ালে বন্দুক, গ্রেনেড ও গোলাবারুদ সোমালিয়ার উদ্দেশ্যে নেওয়া হতো।
চলতি শতাব্দীর শুরুতে অ্যাঙ্গোলার গৃহযুদ্ধের সময়ও একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক হাব ছিল ইউএই। ১৯৮০-এর দশকে সাউদার্ন এয়ার ট্রান্সপোর্টের বিমান শত শত বার অ্যাঙ্গোলায় যাতায়াত করত। সেগুলো হীরার খনি থেকে পণ্য বহন করেছে এবং অভিযোগ রয়েছে যে তারা আকাশ থেকে বিদ্রোহী সেনাদের জন্য অস্ত্রও ফেলত, যারা অ্যাঙ্গোলার সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ চালাচ্ছিল। ১৯৯০-এর দশকে, যুদ্ধের শেষ দশকে, রুশ অস্ত্র ব্যবসায়ী ভিক্টর বাউট, যিনি ‘মার্চেন্ট অব ডেথ’ নামে পরিচিত ছিলেন, এই ফ্রি জোনগুলোকে অস্ত্র পরিবহনের বিমানঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেন। সব মিলিয়ে দুবাই ও শারজাহ তখন যুদ্ধকে জ্বালানি জোগানো অস্ত্র ও হীরার লজিস্টিকের জন্য অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
বর্তমানে জাফজা মার্কিন নৌবাহিনীর সবচেয়ে বেশি পরিদর্শিত বিদেশি বন্দর। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইউএই-এর বন্দরে সবচেয়ে বেশি মার্কিন জাহাজ অবস্থান করে। একটি ক্ষুদ্র উপসাগরীয় রাষ্ট্র কীভাবে বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রের এত কাছে বসতে পেরেছে সেই গল্প জানাতে গিয়ে ড্রপসাইট লিখেছে, জেফ্রি এপস্টাইন আমিরাতি অভিজাতদের প্রশিক্ষণ ও ইসরায়েল–ইউএই সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিলেন।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের ব্যাপারে এপস্টাইন বিশেষ আগ্রহী ছিলেন জানিয়ে তারা উল্লেখ করেছে, শিশু পতিতাবৃত্তির অভিযোগে প্রথমবারের কারাদণ্ড থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ২০০৯ সালে তিনি গর্ব করে বলেছিলেন যে তার সম্পর্ক আছে “আফ্রিকার হর্নে জিবুতির গভীর সমুদ্র বন্দরের মালিকের সঙ্গে, যা চোরাচালানকারীদের স্বর্গ।” তখন জিবুতি বন্দর ছিল আফ্রিকায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় কনটেইনার টার্মিনাল। এপস্টাইন দাবি করেছিলেন, তার সাথে সুলাইমের সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ ছিল যে তিনি নিজেই কার্যত ওই বন্দরের নিয়ন্ত্রক ছিলেন।
এপস্টাইনের এই মন্তব্যগুলো তখন অতিরঞ্জিত মনে হলেও, সুলাইমের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের দাবি এখন প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে খবরে বলা হয়, তাদের কথোপকথনগুলোতে এটা স্পষ্ট যে ২০০৬ সাল থেকে ২০১৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এপস্টাইনের সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রধান বিন সুলাইমের অসাধারণ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
যে পথে বাংলাদেশে আসে ডিপি ওয়ার্ল্ড
বিন সুলাইমের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রথম সাক্ষাতের খবর পাওয়া যায় গত বছরের ২৩ জানুয়ারি। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সেদিনের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “বিশ্বের দুই বৃহত্তম বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড ও এ. পি. মোলার-মেয়ার্স্ক বাংলাদেশের শিপিং শিল্পে বড় আকারের বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তারা বঙ্গোপসাগরের উপকূলজুড়ে নতুন বন্দর নির্মাণে সহায়তা করতে এবং বাংলাদেশকে একটি প্রধান বৈশ্বিক রপ্তানি কেন্দ্রে পরিণত করতে চায়।”
প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার জানান, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে দাভোসে (সুইজারল্যান্ড) ডিপি ওয়ার্ল্ডের গ্রুপ চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ বিন সুলাইম এবং এ. পি. মোলার-মেয়ার্স্ক চেয়ারম্যান রবার্ট মোলার উগলা বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠককালে এই প্রস্তাব দেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাটি লিখেছিল, “ডিপি ওয়ার্ল্ডের সিইও জানিয়েছেন, তারা চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজজট কমাতে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করে বন্দরটির দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে (এনসিটি) বিনিয়োগ করতে চায়।” এনসিটিতে তাঁদের বিনিয়োগ বাংলাদেশে আরও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সহায়তা করবে বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।
বাসসের সংবাদে প্রকাশ, সুলতান আহমেদ বিন সুলাইম উল্লেখ করেন যে ডিপি ওয়ার্ল্ড যেখানে বিনিয়োগ করেছে, সেখানেই উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটেছে। তিনি আরও জানান, ২০২২ সালে তাঁরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তখনকার সরকার তাঁদের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। সুলতান আহমেদ বিন সুলাইম জানান, তারা চট্টগ্রাম বন্দরে একটি ডিজিটাল অনলাইন কাস্টমস পদ্ধতি চালু করতে চান, যা দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে। তিনি আরও জানান, তারা বাংলাদেশের ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলোতেও বিনিয়োগ করতে চান।
প্রধান উপদেষ্টা সুলতান আহমেদ বিন সুলাইমকে বলেন, “বাংলাদেশ চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে এবং বঙ্গোপসাগরের উপকূলজুড়ে আরও বন্দর নির্মাণ করতে চায়।” তিনি সেদিন ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং ডেনমার্কভিত্তিক এ.পি. মোলার-মেয়ার্স্কের কর্মকর্তাদের ঢাকায় আসার এবং বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করার আমন্ত্রণ জানান।

এরই ধারাবাহিকতায় ৯ এপ্রিল সুলতান আহমেদ বিন সুলাইম ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেদিনের সংবাদেও বাসস জানায়, দাভোসে অনুষ্ঠিত তাদের আগের আলোচনার সূত্র ধরে এনসিটিতে বিনিয়োগ প্রসঙ্গে আলোচনার কালে সুলতান আহমেদকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “এটি (বাংলাদেশ) সম্ভাবনাময় দেশ। বাংলাদেশে আসুন এবং চলুন আমরা এর সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করি।”
সুলতান সেদিন তার প্রতিষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা এই অংশীদারিত্বের জন্য অপেক্ষা করছি। আপনাদের সমৃদ্ধি মানেই আমাদের সমৃদ্ধি। চট্টগ্রাম থেকে দুবাই, আফ্রিকা—এটাই আমাদের যৌথ স্বপ্ন।”
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন সেদিন বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলনের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ড ইউএই-এর জেবেল আলি বন্দরকে ঘিরে একটি ‘ফ্রি ট্রেড জোন’ (মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল) পরিচালনা করে। বাংলাদেশেও সেরকম অঞ্চল তৈরিতে কোম্পানিটি সহায়তা করতে আগ্রহী।
তিনি বলেছিলেন, “সম্মেলনের তৃতীয় দিনে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে একটা সেশন হয়েছে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ বিন সুলাইম মধ্যপ্রাচ্যের খুব গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোক্তা। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আমাদের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা মহেশখালীকে ঘিরে ফ্রি ট্রেড জোনের দিকে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করছি।”
আশিক চৌধুরীর ভাষ্য ছিল, “জেবেল আলি বন্দর ইউএই-এর অর্থনীতিতে ২৫ শতাংশ অবদান রাখছে। ওইরকমভাবে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কাছাকাছি কোনো একটি জায়গায় আমরা ফ্রি ট্রেড জোন করার চিন্তা করছি। ডিপি ওয়ার্ল্ড থেকে কারিগরি ও অন্যান্য সহায়তা নিয়ে আমরা কাজটা করব। আজ (৯ এপ্রিল) ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যানের আগমনের এটাই মূল উদ্দেশ্য। অচিরেই বাংলাদেশ থেকে একটি টিম সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাবে এবং সেখানে ফ্রি ট্রেড জোন কীভাবে পরিচালিত হয়, তা দেখবে।”
প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদাসহ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ (পিপিপিএ) ও মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (মিডা) দায়িত্বও পেয়েছেন এই কর্মকর্তা। ডিপি ওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সমুদ্র বন্দর ও দুবাইয়ের মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে এপস্টাইন সার্কেল ও ইসরায়েলের প্রভাব সম্পর্কে অবগত আছেন কি না তা জানতে বার্তা পাঠানো হলে কোনো জবাব দেননি তিনি। তার আগে মুঠোফোনে কল করেও আশিকের সাড়া পাননি এই প্রতিবেদক।
গত বছরের পহেলা জুলাই বাসস এক খবরে জানায়, চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (চবক) হাতে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এনসিটি পরিচালনাকারী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক-এর হাত থেকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বন্দরের নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
চুক্তি শেষ হওয়ায় গত ৬ জুলাই সাইফ পাওয়ারটেক এনসিটি থেকে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। ৭ জুলাই থেকে শুরু হয় চট্টগ্রাম বন্দরের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতার পরীক্ষা। প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ৬ মাস এনসিটি চালাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ জন্য প্রতি মাসে ৭ কোটি টাকা হিসেবে ৪২ কোটি টাকার ব্যয় বরাদ্দ চাওয়া হয় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে।
সরকারি এই সংবাদে আরও জানানো হয়, চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্ববৃহৎ কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটি। ২০০৭ সালে ৫৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এই টার্মিনাল নির্মাণ করে। তবে কার্যক্রম শুরু করতে কয়েক বছর লেগে যায়। এই টার্মিনালে ৫টি জেটি রয়েছে। রয়েছে কি-গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। চট্টগ্রাম বন্দরের ৪টি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে সবচেয়ে বড় এনসিটির অবকাঠামো নির্মাণ শেষে বিদেশি একাধিক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বিনিয়োগে সরঞ্জাম স্থাপন করে টার্মিনালটি পরিচালনার আগ্রহ দেখিয়েছিল। সে সময় বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক দরপত্রও আহ্বান করেছিল। কিন্তু তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী মহলের দুর্নীতির কারণে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব তাদের অনুগত সাইফ পাওয়ারটেক-এর হাতে চলে যায়। সাইফ পাওয়ারটেক-এর কর্ণধার তরফদার রুহুল আমীন আওয়ামী ঘরানার ব্যবসায়ী এবং দলটির অর্থ জোগানদাতাদের অন্যতম ছিলেন।
চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, সাইফ পাওয়ারটেক পলাতক স্বৈরাচারের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে একচেটিয়া ব্যবসা করেছে। এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর এ পর্যন্ত ১২ বার চুক্তি নবায়ন করেছে। প্রতিবারই এর পেছনে ফায়দা লুটে নিয়েছে শেখ পরিবারের সদস্যসহ আওয়ামী লীগের বেশ কিছু প্রভাবশালী নেতা। সাইফ পাওয়ারটেক-এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে বিশেষ সুবিধাভোগী সিন্ডিকেটের সদস্য ছিলেন শেখ হেলাল, শেখ সেলিম, সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, সাবেক সংসদ সদস্য আলী আজম মুকুল ও এম এ লতিফসহ আরও অনেক প্রভাবশালী নেতা।
“ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পালিয়ে যাওয়ার আগে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি টার্মিনালকে দুবাই ভিত্তিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদল কয়েক দফা চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শনও করেছেন। শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী নেতাদের সেই সুযোগ হয়নি,”—এভাবেই লিখেছে সংবাদ সংস্থাটি।
বিন সুলাইমের এপস্টাইন ও ইসরায়েল সংযোগ
বৈশ্বিক লজিস্টিকস ও বন্দর পরিচালনায় অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত সুলতান আহমেদ বিন সুলাইমের সঙ্গে জেফ্রি এপস্টাইনের সংযোগ নিয়ে গত বছরের পহেলা অক্টোবর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (ডব্লিউএসজে)।
তারা লিখেছিল, “নতুন প্রকাশিত আর্থিক রেকর্ডে দেখা যায়, ২০১৭ সালে সুলতান আহমেদ বিন সুলাইম এপস্টাইনকে ৬,২০০ ডলার প্রদান করেছিলেন। একদিন পর এপস্টাইন একই পরিমাণ অর্থ আবার বিন সুলাইমকে ফেরত দেন। এ ছাড়া, ২০১১ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে এপস্টাইনের ম্যানহাটনের টাউনহাউসে বিন সুলাইমের সফরের সময়সূচি নির্ধারিত ছিল।”
ডব্লিউএসজে জানায়, বিন সুলাইমের সঙ্গে ওই অর্থ আদান-প্রদানকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখা হচ্ছে; কারণ এটি কোনো ব্যবসায়িক চুক্তির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। এপস্টাইনের টাউনহাউসে যাওয়ার সময়সূচি থাকা মানে তিনি এপস্টাইনের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। নিজের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রকাশিত হওয়ার পরও এপস্টাইন বিভিন্ন ধনী ব্যবসায়ী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন বলেও উল্লেখ করে ডব্লিউএসজে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ওয়াইঅন গত ১৯ ডিসেম্বর এক প্রতিবেদনে বলেছে, নতুন প্রকাশিত ইমেইলগুলো বিন সুলাইমের সাথে জেফ্রি এপস্টাইনের মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক উন্মোচন করেছে। ২০০৭ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে তাঁরা ডজন নয়, শতাধিক ইমেইল বিনিময় করেছেন।
ওয়াইঅন জানিয়েছে, “এই যোগাযোগ শুধু ব্যবসায়িক ছিল না; এতে ব্যক্তিগত অনুরোধ, সংবাদ প্রতিবেদন শেয়ার করা এবং সাক্ষাতের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। মার্কিন কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যদের প্রকাশিত ছবিতে এমনও দেখা গেছে এপস্টাইন ও বিন সুলাইম একসাথে রান্না করছেন, যা তাদের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার মাত্রা তুলে ধরেছে বলেও উল্লেখ করেছে এই সংবাদমাধ্যম।”

“বিশ্বব্যাপী বন্দর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগে সুলাইম ছিলেন সেই মানুষ যিনি আক্ষরিক অর্থে বিশ্বের মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন,” উল্লেখ করে ওয়াইঅন লিখেছে, “তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ‘নাখিল’-কে; যে রিয়েল এস্টেট জায়ান্ট পাম আইল্যান্ড এবং দ্য ওয়ার্ল্ড দ্বীপপুঞ্জের পেছনে রয়েছে। এই কৃত্রিম দ্বীপমালা দুবাইয়ের সম্পদের প্রতীকী নিদর্শন।”
ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক ড্রপসাইট নিউজ-এর বরাত দিয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ডিজিটাল নিউজ প্ল্যাটফর্ম মিডল ইস্ট আই-এ প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, জীবনের শেষ দুই দশকে মার্কিন অর্থলগ্নিকারী জেফ্রি এপস্টাইন তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুলতান আহমেদ বিন সুলাইমের মাধ্যমে ইসরায়েল ও ইউএই-র অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক এবং বিন সুলাইমের মধ্যে একাধিক গোপন বৈঠক আয়োজন করেন। তাঁদের বৈঠকগুলোকে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এর পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বৈঠকগুলো আব্রাহাম অ্যাকর্ডস, অর্থাৎ ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত ইসরায়েল-ইউএই সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তি সম্পাদনের আগেই হয়েছে উল্লেখ করে সংবাদে দাবি করা হয়, এই চুক্তির মাধ্যমে প্রকাশ্যে স্বাভাবিক হওয়ার অনেক আগেই কয়েক দশক ধরে ইসরায়েল ও ইউএই নীরবে বিস্তৃত গোয়েন্দা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। ড্রপসাইট লিখেছে, “চুক্তির পর সেই সম্পর্কটি পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসে। কয়েক মাসের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়, এক বছরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এক বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায় এবং পরের বছর একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হয় যা অধিকাংশ শুল্ক বাতিল করে।”
আমিরাতের বিনিয়োগকারীরা ইসরায়েলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জৈবপ্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা কোম্পানিতে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছে বলে জানিয়েছে তারা। “আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরের এক বছর আগে মারা যান এপস্টাইন। তাই তিনি আবুধাবি ও তেল আবিবের সম্পর্ক প্রকাশ্যে আসতে দেখেননি। তবে ইসরায়েলি ও আমিরাতি অভিজাতদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য তার আড়ালের প্রচেষ্টা এই কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভিত্তি স্থাপন করেছে, যা এখন পুরো অঞ্চলকে পুনর্গঠন করছে,” বলেও উল্লেখ করা হয় তাদের প্রতিবেদনে। আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরের দুই মাস পর বিন সুলাইম ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষ থেকে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন, যাতে বলা হয় ইসরায়েলের বন্দর ও ফ্রি জোন উন্নয়নের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে এবং ইসরায়েলের ইলাত ও দুবাইয়ের জেবেল আলির মধ্যে একটি সামুদ্রিক সেবা চালু করা হবে।

ফাঁস হওয়া ২০১৩ সালের ১৮ জুনের এক মেইল নিশ্চিত করেছে, সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে এহুদ বারাকের একটি ব্যক্তিগত বৈঠকেরও মধ্যস্থতা করেছিলেন এপস্টাইন। একই সময়ে সুলাইমকে ইসরায়েলের লজিস্টিক অবকাঠামোয় বিনিয়োগে জড়ানোর চেষ্টা করছিলেন এপস্টাইন। বারাক রাশিয়া থেকে ইসরায়েলে ফেরার পর ২০১৩ সালের ৪ জুলাই এপস্টাইন বারাককে যে ইমেইল পাঠান, সেখানে ইসরায়েলের বন্দরগুলোতে বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের লিংক দিয়ে লিখেছিলেন, “এটা কি সুলতানের জন্য কিছু?” তবে বারাক জবাবে বলেন, “আমার মনে হয় এটা একটু তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে।” তবে তিনি এপস্টাইনকে সম্পর্কটি আরও এগিয়ে নিতে উৎসাহ দেন। তিনি বলেন, “আমার মনে হয় আমাদের আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে কীভাবে এই সম্পর্ককে কাজে লাগানো যায়।”
২০১৫ সালের জুনে সেন্ট পিটার্সবার্গের গ্রীষ্মকালীন সম্মেলনে বারাক ও বিন সুলাইম আবারও মুখোমুখি হন। সেদিনের ঘটনা প্রসঙ্গে এপস্টাইনকে বারাক লিখেছিলেন, “আমি তার কাছে ঋণী। গতবার সে আমার কফি ও নাশতার দাম দিয়েছে।” এপস্টাইন জবাবে লেখেন, “তুমি যেমন খাও, তুমি তার কাছে অনেক ঋণী।” এপস্টাইনের মধ্যস্থতায় তাদের সম্পর্ক আরও আন্তরিক হতে থাকে। ২০১৮ সালের ৫ আগস্ট এপস্টাইনকে বিন সুলাইমের করা ইমেইলে ডিপি ওয়ার্ল্ড পরিচালিত সমুদ্রবন্দরগুলোতে কর্মীদের নিরাপত্তায় ইসরায়েলি সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি ‘কারবাইন’-এর সেবা নেওয়ার আগ্রহ ব্যক্ত করা হয়। এই প্রতিষ্ঠানে এপস্টাইনের অর্থায়ন ছিল এবং চেয়ারম্যান হিসেবে নেতৃত্বে ছিলেন বারাক।
এপস্টাইন যখন বিন সুলাইমের পরিবারের জন্য বিশ্বমানের ইসরায়েলি চিকিৎসা সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা করেন, ইউএই ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারিত্ব তখন ব্যক্তিগত পর্যায়েও গভীর হতে শুরু করে। ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এপস্টাইন সুলাইমকে থেরাপিস্ট ও চিকিৎসকদের সঙ্গে যুক্ত হতে সাহায্য করেন। বিন সুলাইম নিজের মেয়ের জন্য ইসরায়েলি স্নায়ুবিজ্ঞানী শাই এফ্রাতির চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁর মেয়ে কোনো এক বড় অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠার পর বাকশক্তি হারিয়েছিলেন।
বিন সুলাইম এপস্টাইনকে এফ্রাতি সম্পর্কে একাধিক ইমেইল পাঠান, যার মধ্যে ছিল “মৃতদের আবার জীবিত করে তোলা” শিরোনামে বিবিসি ফিউচারে প্রকাশিত নিবন্ধ; যেখানে এফ্রাতির হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপির কথা বলা হয়েছে। সাথে ছিল এফ্রাতির টেডএক্স বক্তৃতার লিংক, যার শিরোনাম ছিল “বার্ধক্য উল্টে দেওয়া।” এপস্টাইনকে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, “তুমি কি এই লোকেদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারো এবং দেখতে পারো এটা আমার মেয়ের কাজে আসবে কি না?”
সুলতান আহমেদ বিন সুলাইম এখন পর্যন্ত জেফ্রি এপস্টাইনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বা যোগাযোগ নিয়ে জনসমক্ষে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেননি। তবে এপস্টাইন ছিলেন তার বিশ্বস্ত বন্ধু ও পরামর্শদাতা। এহুদ বারাকের হ্যাক হওয়া ইনবক্স থেকে পাওয়া অজস্র ইমেইলের বরাত দিয়ে ড্রপসাইটের দীর্ঘ প্রতিবেদনে বলা হয়, এপস্টাইন ও সুলাইমের সম্পর্ক দিন দিন ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তাঁকে ব্যবহার করে এপস্টাইন ইসরায়েলের সাথেই ইউএই-র অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার চেষ্টায় ছিলেন।
২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকেই এপস্টাইন একাধিকবার বারাক ও সুলাইমের মধ্যে বৈঠকের আয়োজন করেন। এই বৈঠকগুলো তিনি বারাকের সামনে দুবাইয়ের শাসকের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ এবং ইসরায়েলের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থকে এগিয়ে নেওয়ার উপায় হিসেবে উপস্থাপন করতেন।
তবে বিন সুলাইম ব্যবসার সীমা ছাড়িয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কও উপভোগ করতেন এবং এপস্টাইনের ব্যক্তিগত দ্বীপ লিটল সেন্ট জেমসে ছুটি কাটাতেন। ২০০৭ সালের মার্চে এক আনন্দদায়ক ভ্রমণের পর এপস্টাইন সুলাইমকে লিখেছিলেন, “আশা করি তুমি আনন্দ পেয়েছো, আমি খুশি তোমাকে আমার বন্ধু হিসেবে পেয়ে; তুমি একমাত্র মানুষ যাকে আমি পেয়েছি যে আমার মতোই পাগল।”
একই বছরের নভেম্বর মাসে, ফ্লোরিডায় যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার কয়েক মাস পর এপস্টাইন ও বিন সুলাইমের আলাপচারিতায় দেখা যায়, তারা দুজন কোনো এক নারীকে নিয়ে কথা বলছেন, যে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে নিউ ইয়র্কে বিন সুলাইমের সাথে দেখা করেছিল। সেই নারীর কাছ থেকে বিন সুলাইম যৌনতা প্রত্যাশা করেছিলেন শুনে এপস্টাইন উত্তর দেন, “আল্লাহকে ধন্যবাদ, এখনও তোমার মতো মানুষ আছে।”
শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগে ২০০৮ সালে প্রথমবার কারাবরণের প্রাক্কালে তিনি বিন সুলাইমকে লিখেছিলেন, তাঁদের সব যৌথ অভিযানের ধারাবাহিকতা কিছুদিনের জন্য বন্ধ রাখতে হবে। তিনি বলেন, “দুর্ভাগ্যবশত মনে হচ্ছে আমি এক বছরের জন্য জোরপূর্বক ছুটিতে যাচ্ছি। আমি চাই দ্রুত এই অধ্যায় শেষ করতে, তারপর তোমার সঙ্গে সময় কাটাতে।”
২০১৩ সালে এক সাংবাদিক এপস্টাইনের নিউ ইয়র্কের প্রাসাদে গিয়ে দেখেন, প্রবেশকক্ষের দেয়ালে একটি ছবি টাঙানো আছে যেখানে এপস্টাইনকে আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে দেখা যাচ্ছে; সেখানে তাঁদের দুজনের পরনে ছিল সমুদ্রসৈকতের পোশাক।
এপস্টাইন নথিতে কেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস?
এপস্টাইন ফাইলসের যে নথিগুলোতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম উল্লেখ রয়েছে, সেখানে সরাসরি কোনো অপরাধমূলক অভিযোগ পায়নি ডিএসজে প্রতিবেদক। ড. ইউনূস এই নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে কোনো অনৈতিক কাজে জড়িত ছিলেন—এমন কোনো প্রমাণও নথিতে নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ড. ইউনূসের নাম আসার প্রধান কারণ আল সেকেলের সাথে তাঁর যোগাযোগ।
অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীদের পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার কাজে এপস্টাইনের প্রধান সহযোগী গিসলেইন ম্যাক্সওয়েলের বোন ইসাবেল ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গী ছিলেন আল সেকেল। তিনি এপস্টাইনেরও ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তার অর্থায়নে বিভিন্ন ইভেন্ট পরিচালনা করতেন। সেকেল নিজেকে ড. ইউনূসের একজন ঘনিষ্ঠ শুভাকাঙ্ক্ষী বা মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করতেন বলেও নথিগুলোতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
আল সেকেল এবং তার সঙ্গী ইসাবেল ড. ইউনূসকে বিখ্যাত কার্টুন সিরিজ ‘দ্য সিম্পসনস‘-এ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে মধ্যস্থতা করেছিলেন। এপস্টাইনকে পাঠানো ২০১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরের ইমেইলে আল সেকেল জানান, তিনি ও তার স্ত্রী ইসাবেল ড. ইউনূসকে ‘দ্য সিম্পসনস’ কার্টুন সিরিজের স্রষ্টা ম্যাট গ্রোনিংয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। যারই সুবাদে ড. ইউনূস দ্য সিম্পসনস-এর একটি পর্বে অতিথি চরিত্র হিসেবে উপস্থিত হন। পর্বটির নাম ছিল ‘লোন-এ-লিসা’; যার গল্প ছিল মাইক্রোফাইন্যান্স নিয়ে। এটি ২০১০ সালের ৩ অক্টোবর প্রচারিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ড. ইউনূসকে পপ কালচারের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আরও পরিচিত করা। ড. ইউনূস এবং ম্যাট গ্রোনিং একসাথে দুপুরের খাবার খেয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলেও এপস্টাইনকে জানিয়েছিলেন আল সেকেল।

ফাইলগুলো মূলত অপটিক্যাল ইলিউশন জনপ্রিয় করার জন্য পরিচিত মার্কিন লেখক ও ভিজ্যুয়াল ইলিউশন সংগ্রাহক আল সেকেলের কর্মকাণ্ড এবং এপস্টাইনের সাথে তার যোগাযোগ বিষয়ক, যেখানে ড. ইউনূস একজন ‘প্রভাবশালী পরিচিত ব্যক্তি’ হিসেবে উল্লিখিত হয়েছেন। তাঁকে কোনো অপরাধী হিসেবে নয়, বরং একজন বৈশ্বিক আইকন হিসেবে দেখানো হয়েছে—যার সাথে এপস্টাইনের সার্কেলের কিছু সদস্য যোগাযোগ স্থাপনে সফল হয়েছিলেন।
এই সার্কেলের লোকজন, বিশেষ করে আল সেকেল, ড. ইউনূসের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী ছিলেন এবং তাঁকে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলেও পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিলেন। ড. ইউনূস বিভিন্ন সময় এপস্টাইনের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়োজিত বুদ্ধিবৃত্তিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে, বাসস এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা নেওয়ার পর ইউএই-র শাসক শ্রেণির একাধিক প্রভাবশালীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বা সাক্ষাৎ হয়েছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ইউএই-র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী এবং দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাকতুমের আমন্ত্রণে ওয়ার্ল্ড গভর্নমেন্ট সামিটে (ডব্লিউজিএস) অংশ নেন।
সেখানে তিনি ইউএই-র স্বাস্থ্যমন্ত্রী আব্দুর রহমান বিন মোহাম্মদ আল ওয়াইস, বাণিজ্যমন্ত্রী থানি বিন আহমেদ আল জেয়ৌদি এবং ক্রীড়ামন্ত্রী ড. আহমদ বেলহৌল আল ফালাসির সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া দুবাই কালচার অ্যান্ড আর্টস অথরিটির চেয়ারম্যান শেখা লতিফা বিনতে মোহাম্মদ বিন রাশিদ আল মাকতুমের সঙ্গেও তাঁর সাক্ষাৎ হয়।
একই বছরের মে মাসে ইউএই-র টলারেন্স অ্যান্ড এক্সিস্টেন্স বিষয়ক ক্যাবিনেট মন্ত্রী শেখ নাহায়ান বিন মুবারক আল নাহায়ানের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এসব সরাসরি বৈঠকের পাশাপাশি প্রফেসর ইউনূস ইউএই নেতৃত্বের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করে ভিসা সহজীকরণ, জনশক্তি রপ্তানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা ও খেলাধুলায় সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণ করার পরপরই, অর্থাৎ ২০২৪ সালের আগস্টেই তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ মোহামেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। দুই দেশের সম্পর্কের উন্নতি প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছিলেন, পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের কারণে ইউএই সরকারের সাথে বাংলাদেশের একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল; যার প্রভাব পড়ছিল সেখানকার প্রবাসীদের ওপর। নতুন করে ভিসা দেওয়াও বন্ধ ছিল। তাই সম্পর্ক উন্নয়নে “প্রফেসর ইউনূস উদ্যোগ নিয়েছেন,” বলেছিলেন তিনি।
এরই ধারাবাহিকতায় অক্টোবরে ইউএই-র জ্বালানি ও অবকাঠামো মন্ত্রী সুহাইল মোহাম্মদ আল মাজরুই বাংলাদেশ সফর করেন এবং ডিসেম্বরে দেশটির শাসকরা ৪৪০ বাংলাদেশি বন্দিকে রাজকীয় ক্ষমা ঘোষণা করেছেন।













