বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। গত ১৮ মাসের অস্থিরতা কাটিয়ে স্থিতিশীলতার পথে কিছুটা অগ্রগতি হলেও প্রবৃদ্ধির গতি এখনও নাজুক। এই ভঙ্গুরতা কাটাতে এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে আগামী নির্বাচিত সরকারকে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই অর্থনৈতিক সংস্কারের ‘রাজনৈতিক মালিকানা’ বা দায়বদ্ধতা নিতে হবে।
সোমবার রাজধানীর হোটেল আমারি’তে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআরআই) এবং অস্ট্রেলিয়ান সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের (ডিএফএটি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সংলাপে এসব কথা বলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা।
“ম্যাক্রোইকনমিক ইনসাইটস: নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি অর্থনৈতিক সংস্কার এজেনন্ডা” শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে পিআরআই এর প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক সরকারের উচিত হবে রাজস্ব ও আর্থিক খাতে সাহসী সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া।
আর্থিক খাতের সংস্কারে পাঁচটি বিষয়ে শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) চাপ মোকাবিলায় একটি কার্যকর অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, যেখানে মালয়েশিয়া ও চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।
সম্ভাব্য ব্যাংক ব্যর্থতা মোকাবিলায় শক্তিশালী আইনি কাঠামো তৈরির পাশাপাশি ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস ডিভিশন (এফআইডি) এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অবসান ঘটিয়ে একক নিয়ন্ত্রক কাঠামো নিশ্চিত করার উপর জোর দেন আশিকুর রহমান।
তিনি আরও বলেছেন, ব্যাংক কোম্পানি আইন বদলে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ তাদের কাজের জন্য জবাব দিতে বাধ্য থাকে। পাশাপাশি খেয়াল রাখতে হবে, কোনো শক্তিশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যেন ব্যাংকগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে না পারে। এ জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পুরো স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে এবং তাদের কর্মকাণ্ডের হিসাব সংসদের কাছে তুলে ধরার নিয়ম চালু করতে হবে।
ড. রহমান রাজস্ব খাতের পশ্চাৎমুখী কর কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের অনুপাত ৫০:৫০-এ উন্নীত করতে হবে। করভিত্তি সম্প্রসারণ, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার এবং ভর্তুকি ব্যয় যৌক্তিক করার পাশাপাশি বাণিজ্য করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আয় ও সম্পত্তি করের দিকে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
তার মতে, সংস্কার প্রক্রিয়ায় ‘দ্রুত পদক্ষেপ’ নিতে হবে। রাজনৈতিক চক্রের শেষ ভাগে সংস্কার করা কঠিন হয়ে পড়ে, তাই সরকারের মেয়াদের শুরুতেই এই ঝুঁকি নিতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই কিছু অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সেগুলোর বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছে। সামনে এগিয়ে যেতে নীতি ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে।
“তারা বুঝতে পেরেছে যে দৃশ্যমান ফলাফল না দিলে আগের মতো অস্পষ্ট বক্তব্য দিয়ে পার পাওয়া যাবে না। অর্থবহ পরিবর্তন না এলে মানুষ আবারও রাস্তায় নেমে তাদের ক্ষমতা কেড়ে নেবে।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে একটি জড়তার সমস্যা রয়েছে। যারা বিদ্যমান ব্যবস্থার সুবিধাভোগী, তারা পরিবর্তনের গতি কমিয়ে দিতে চায় এবং ধরে নেয় যে গত দশ বছর যা চলেছে, আগামী দশ বছরও তাই চলবে। অন্যদিকে, কিছু গতিশীল পক্ষ অতিরিক্ত দ্রুত সংস্কার চাপিয়ে দিতে চায়। কিন্তু নীতিনির্ধারণ টেলিভিশন টকশোর আলোচনার ভিত্তিতে করা যায় না।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের মানুষ পরিশ্রমী ও দক্ষ। বেসরকারি খাতের প্রয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ প্রণোদনা, এটাই নির্বাচিত সরকারের প্রধান মনোযোগের ক্ষেত্র হওয়া উচিত।”
অনুষ্ঠানের সভাপতি পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বর্তমান পরিস্থিতিকে ১৯৯০-৯১ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেন। তিনি বলেন, ১৯৯১ সালের মতো এবারও একটি গণতান্ত্রিক সরকার অর্থনৈতিক সংস্কারে নেতৃত্ব দেবে বলে আমরা আশা করি।
তিনি জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তিকে (ইপিএ) একটি ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে অভিহিত করেন। রাজস্ব ব্যবস্থা নিয়ে তার কঠোর মন্তব্য ছিল, “এনবিআর বর্তমানে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে।”
মোট রাজস্বের ২৮ শতাংশ বাণিজ্য কর থেকে আসায় তা রপ্তানি বহুমুখীকরণে বাধা সৃষ্টি করছে। এলডিসি উত্তরণের পর ডব্লিউটিও-এর বিধি মানতে হলে আমাদের কর কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে বলেও তিনি জানান।
বিআইডিএস-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. কে. এ. এস. মুর্শিদ বলেন, অনেক সময় সংস্কার দেশীয় মালিকানার পরিবর্তে আইএমএফের শর্তে পরিচালিত হয়, যা কাম্য নয়।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা, বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সংস্কার এজেন্ডার কেন্দ্রে থাকতে হবে। তিনি দক্ষতা ও কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষাব্যবস্থার ওপর জোর দেন এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ বলেন, বাংলাদেশ একটি ত্রিমুখী রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে; গণতন্ত্রের গভীরতা, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও অর্থনীতির পুনর্গঠন।”
তিনি সময়নির্ধারিত ও সমন্বিত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আহরণ ও আর্থিক খাত সংস্কারে।
অনুষ্ঠানের সমাপনীতে পিআরআই পরিচালক ড. আহমাদ আহসান বলেন, বিশ্ব বাণিজ্যের ২৯ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারে বাংলাদেশের সম্ভাবনা সীমাহীন। শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানিই ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি চামড়া, ওষুধ ও ইলেকট্রনিক্স খাতে গুরুত্ব দিলে এবং ১৯৯১ সালের মতো সাহসী সংস্কার করলে প্রবৃদ্ধি ও কল্যাণের নতুন স্তরে পৌঁছানো সম্ভব।
অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার ক্লিন্টন পবকে জানান, সঠিক সংস্কার হলে বাংলাদেশের পক্ষে ৮-১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব নয় এবং অস্ট্রেলিয়া এই অগ্রযাত্রায় পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।













