ছবি: বাসস অবলম্বনে ডিএসজে কোলাজ
দেশের অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়ন অগ্রগতি নিয়ে গণমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর বার্তা ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন সরকার প্রধানের প্রেস সচিব শফিকুল আলম। ঢাকায় পরিকল্পনা কমিশনের এক অনুষ্ঠানে সোমবার (৮ ডিসেম্বর) তিনি বলেন, “সরকারের অর্জন ও বাস্তব চ্যালেঞ্জের সঠিক চিত্র উপস্থাপনের বদলে অনেক ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিকৃত তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, যা জনমনে মিশ্র ও ভ্রান্ত বার্তা তৈরি করছে।”
শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ স্টেট অব দ্য ইকোনমি ২০২৫’ ও ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাংলাদেশ অগ্রগতি প্রতিবেদন ২০২৫’ শীর্ষক প্রকাশনা অনুষ্ঠানে কথা বলছিলেন শফিকুল আলম। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৬ মাসে কিছু গণমাধ্যম ও আলোচক একপেশে তথ্য ব্যবহার করে পরিস্থিতি বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, “অল্পসংখ্যক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বক্তব্য অতিরিক্ত গুরুত্ব পায়; অথচ দেশের বৃহৎ অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও সরকারের নীতিগত কাজগুলো আলোচনার বাইরে থাকে।”
কিছু ব্যবসায়ী নেতার এমন মন্তব্যও প্রেস সচিব উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন। “কেউ কেউ এমন ভাষায় কথা বলছেন যেন বাংলাদেশের পরিস্থিতি ১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবী নিধনের সময়ের সমান। এমন মন্তব্য শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীনই নয়—এটি বাস্তবতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়,” যোগ করেন এই কর্মকর্তা।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধিকে জাতীয় কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য অত্যাবশ্যকীয় বলে উল্লেখ করে বলেন, “বন্দরের অদক্ষতার কারণে প্রতিদিন ব্যবসায়ীরা হাজার হাজার ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন; তবু সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সংস্কার প্রক্রিয়াকে পর্যাপ্ত সমর্থন দিচ্ছে না।”
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে অতিরঞ্জিত অভিযোগের কথাও উল্লেখ করেন শফিকুল। এছাড়া দারিদ্র্যের হার নিয়ে তিনি বলেন, “যেভাবে বলা হচ্ছে যেন দারিদ্র্য হঠাৎ ২০ শতাংশ থেকে ২৮ শতাংশ হয়ে গেছে এবং তা এই সরকারের সময়েই ঘটেছে—এটি সম্পূর্ণ ভুল ফ্রেমিং। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার ডেটা অনুযায়ী সাম্প্রতিক অর্থবছরের শেষে দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশ এবং চলতি বছরে তা আরও কমার সম্ভাবনা রয়েছে।”
অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “সাম্প্রতিক সংস্কার, বিনিময় হার স্থিতিশীলতা, কম মুদ্রাস্ফীতি ও শক্তিশালী রেমিট্যান্স চ্যানেল দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তিতে আস্থা ফিরিয়ে এনেছে।” তবে “সংস্কারের কোনো নির্দিষ্ট ক্রম নেই,” উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কার্যকর নীতি প্রণয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় ছাড়া টেকসই ফল পাওয়া কঠিন।”
“বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের পরও আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা হয়েছে,” দাবি করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ. মনসুর বলেন, “বিনিময় হার বাজারভিত্তিকভাবে স্থিতিশীল এবং বৈদেশিক খাত ইতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।” তিনি বলেন, প্রকৃতপক্ষে খেলাপি ঋণের (এনপিএল) পরিমাণ দীর্ঘদিন ধরে কম দেখানো হচ্ছিল। স্বচ্ছতা আনার পর দেখা গেছে, প্রকৃত খেলাপি ঋণের হার ৩৫ শতাংশেরও বেশি, যা স্বীকার করতে অস্বস্তিকর হলেও এটি বাস্তব সত্য।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ স্টেট অব দ্য ইকোনমি ২০২৫’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ অর্থবছরের শেষ ছয় মাসে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পুনরুদ্ধারের আশাব্যঞ্জক লক্ষণ দেখা গেছে। বিভিন্ন পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধি শ্লথ হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও প্রধান সূচকগুলো ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের দিকে ইঙ্গিত করছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি কিছুটা কম থাকলেও ২০২৬ অর্থবছরে তা পুনরায় গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটি বহিঃখাতের স্থিতিশীলতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ তুলে ধরে—শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ, আমদানি স্থিতিশীলতা এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পুনরুদ্ধার বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরার ইঙ্গিত দিচ্ছে। রপ্তানি আয় বিশেষত তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের প্রতিযোগিতাশীলতা, নীতি মেনে চলা ও বাজার বহুমুখীকরণের ফলে শক্তিশালী রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও তিন মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটাতে সক্ষম অবস্থায় স্থিতিশীল রয়েছে, যা সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক প্রতিফলন।
তবে প্রতিবেদনটি দুর্বল বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প কার্যক্রমকে প্রবৃদ্ধির বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সীমিত রিজার্ভ, বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট, ক্রেতাদের পরিবর্তিত পছন্দ এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে না পারলে প্রবৃদ্ধি মন্থর হতে পারে এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। জিইডি জোর দিয়ে বলেছে, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাত স্থিতিশীল করা ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য অপরিহার্য।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, “দেশের অর্থনীতি বর্তমানে ইতিবাচক ও নেতিবাচক সূচকের দ্বৈত চাপে রয়েছে।” তিনি কিছু ইতিবাচক সূচক হিসেবে রেমিট্যান্স প্রবাহের বৃদ্ধি, অর্থপাচারে পতন, রাজস্ব আদায়ে গতি এবং মোটামুটি স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহকে উল্লেখ করেন।
তবে নেতিবাচক সূচকগুলো আরও ভারী: মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ, প্রকৃত মজুরি নিম্নমুখী, কর্মসংস্থান অপরিবর্তিত, রপ্তানি ও বিনিয়োগে ধীরগতি—এসবের কথা উল্লেখ করে ড. জাহিদ বলেন, “বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক দারিদ্র্য মূল্যায়ন অনুযায়ী দরিদ্র ও নতুন দরিদ্র—দুই ধরনের মানুষের সংখ্যাই বেড়েছে।” তিনি আরো বলেন, “অর্থনীতি সংগ্রাম করছে এবং জীবিকার ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে; পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত, কিন্তু তা হয়নি, আবার আরও ভালোও হতে পারত—সেটাও হয়নি।”
ড. জাহিদ তিনটি কারণ তুলে ধরেন যা পরিস্থিতি আরও খারাপ না হওয়ার পেছনে কাজ করেছে: সামাজিক রেজিলিয়েন্স, অন্তর্বর্তী সরকারের আপেক্ষিক রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় আত্মঘাতী আচরণের পরিবর্তন। নির্বাচনী প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “বর্তমান রাজনৈতিক গতিবিধি এমন যে বড় ধরনের রাজনৈতিক ভূমিকম্প না হলে নির্বাচনের গতিবিধি থামানো কঠিন।” সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, “ইচ্ছার সঙ্গে রাজনৈতিক ধৈর্য না থাকলে বাস্তব সংস্কার সম্ভব হবে না।”













