বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ও উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত অধ্যায় হিসেবে আজ রোববার (২৫ জানুয়ারি) চলতি অর্থবছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একনেক সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এটিই বর্তমান প্রশাসনের শেষ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা। প্রধান উপদেষ্টা ও একনেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে এই বিশেষ সভায় ২৬টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপিত হবে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সব মিলিয়ে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অষ্টম এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের ১৯তম সভা।
আজকের সভার আলোচ্যসূচিতে মোট ২৩টি উন্নয়ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত থাকলেও শেষ মুহূর্তে আরও ৩টি প্রকল্প সরাসরি টেবিল উপস্থাপনার মাধ্যমে যুক্ত হতে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে সভায় ১৪টি সম্পূর্ণ নতুন প্রকল্প, ৪টি সংশোধন এবং ৫টি পুরোনো প্রকল্পের মেয়াদ চতুর্থবারের মতো বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ ছাড়া পরিকল্পনা উপদেষ্টা কর্তৃক ইতিপূর্বে অনুমোদিত আরও ১০টি প্রকল্প একনেকের আনুষ্ঠানিক অবগতির জন্য পেশ করা হবে। পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো ইতিমধ্যে প্রকল্পগুলোর কারিগরি ও অর্থনৈতিক উপযোগিতা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। বিদায়ী এই সভায় নতুন প্রকল্প অনুমোদনের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।
প্রকল্পের অগ্রাধিকার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এবারের সভায় ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে পানি সম্পদ, জননিরাপত্তা, বিমানবন্দর, রেল ও কৃষি খাতের উন্নয়ন প্রস্তাবগুলো বিশেষ প্রাধান্য পাচ্ছে। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বিশ্লেষণে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ ৫টি প্রকল্প সভায় তোলা হচ্ছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্বরাষ্ট্র এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে একাধিক প্রকল্পের প্রস্তাব রয়েছে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের মধ্যে রয়েছে রেলপথ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত, যুব ও ক্রীড়া, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।
নতুন প্রকল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিদ্যালয়-বহির্ভূত শিশুদের জন্য বিকল্প শিক্ষার সুযোগ তৈরি এবং ১ হাজার শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল নির্মাণ। অবকাঠামোগত উন্নয়নের তালিকায় রয়েছে রাঙ্গামাটির মানিকছড়ি-মহালছড়ি-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্তকরণ এবং মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন। জননিরাপত্তা জোরদার করতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ক্যাম্প, নৌ-পুলিশ কেন্দ্র এবং ট্যুরিস্ট পুলিশ সেন্টার নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিষ্কার বায়ু প্রকল্প এবং আশুগঞ্জ-পলাশ সবুজ প্রকল্পের মতো উদ্যোগগুলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। এ ছাড়া স্যানিটেশন খাতে নারী উদ্যোক্তা তৈরি ও শিক্ষিত যুবদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রকল্পগুলো সামাজিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বড় বিনিয়োগ ও সময়সীমা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় প্রায় সাড়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাবটি আজকের সভার অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয়। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরের লালখান বাজার থেকে শাহ আমানত বিমানবন্দর পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ এবং দোহাজারী থেকে কক্সবাজার হয়ে গুনদুম পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাবগুলোও পর্যালোচিত হবে। জরুরি জনগুরুত্ব বিবেচনায় স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবা উন্নয়ন প্রকল্প এবং রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের মতো বড় প্রস্তাবগুলো সরাসরি একনেক টেবিলে উপস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিকল্পনা বিভাগ। এই সভার মাধ্যমে অনুমোদিত প্রকল্পগুলো দেশের টেকসই অবকাঠামো ও আর্থসামাজিক মানচিত্রে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।













