প্রতিবেদন

ভোট হোক দুর্নীতিরোধক: কার আশা, কোন ভরসায়?

ছবি: ডিএসজে আর্কাইভ
ছবি: ডিএসজে আর্কাইভ

বিরোধী দল দমন ও নির্বাচন জালিয়াতির মাধ্যমে টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগসহ বিগত সরকারগুলোর ভয়াবহ সব আর্থিক দুর্নীতি, কেলেঙ্কারি বা জুলুম—ভোটের বাজারে এবার প্রার্থী নির্বাচনে এসব কতটা বিবেচনায় রাখবেন বাংলাদেশীরা? ‘জেন-জি’ হিসেবে পরিচিত নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে সরকার ফেলে দেওয়া গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রথম জাতীয় নির্বাচন কি দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশে দুর্নীতির প্রধান প্রতিষেধক হয়ে উঠতে পারবে? নাকি রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের পুরোনো আবর্তেই ঘুরপাক খাবে ক্ষমতার রাজনীতি?

এসব প্রশ্নের জবাব মিলবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। এদিন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল কাঙ্ক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ঠিক দুই মাস আগে (১১ ডিসেম্বর) জাতীয় সম্প্রচারমাধ্যমে আনুষ্ঠানিক তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তবে ভোটের তারিখ ঘোষণার আগেই আলোচনায় ছিল এসব প্রশ্ন। দুর্নীতিগ্রস্ত প্রার্থীদের প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশিষ্টজনেরা। দেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন এসব নিয়ে খোলামেলা কথা বলছেন।

দুদক চেয়ারম্যানের স্পষ্ট বার্তা

তফসিল ঘোষণার মাত্র দুই দিন আগে (৯ ডিসেম্বর) ঢাকায় আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস ২০২৫ উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, যারা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে তাদের নির্বাচিত করলে দুর্নীতি কমবে না। “গত ১৫ বছর যারা দুর্নীতি করেছে, তাদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়ে সীমান্ত পার করে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে রাজনৈতিক এলিটরা। তারা যদি ক্ষমতায় আসে কেমন হবে? তাদের ক্ষমতায় আসার আগে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে,” উল্লেখ করে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, “ওইসব ব্যক্তিদের এবারের জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচিত করার ক্ষেত্রে নিজেদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখন সময় সমাজের উপযুক্ত ব্যক্তিদের নির্বাচিত করার।”

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের খবরে প্রকাশ, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রীর সম্পদ বিবরণীতে ঝামেলা ছিল। এতে জমির পরিমাণ ছিল ৫.১ একর। ট্যাক্স ফাইলেও একই পরিমাণ সম্পদ পাওয়া যায়। কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া যায় ২৯ একর। সে সময়ে এটা ধরা হলে তাঁর মনোনয়ন বাতিল হয়ে যেত। মনোনয়ন বাতিল হলে তিনি এমপি হতেন না, প্রধানমন্ত্রী হতেন না, তাঁর দল ক্ষমতায় আসত কি না সন্দেহ। তাই আমাদের আগে থেকে সচেতন থাকতে হবে। সম্পদ বিবরণীতে অনেক পার্থক্য থাকে।”

ডিএসজে আর্কাইভ

“৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী পালানোর আগে অর্থমন্ত্রী পালালেন, গভর্নর পালালেন। অর্থ ব্যবস্থার সবাই পালালেন। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিও পালালেন। এমনকি বায়তুল মোকাররমের খতিবও পালালেন,” উল্লেখ করে দুদক প্রধান বলেন, “বিপুল পরিমাণ অর্থ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। ওইসব দেশে আমাদের কার্যকর যোগাযোগ নেই, এমনকি যোগাযোগের পথও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। রাষ্ট্রের অর্থ ‘ডার্টি মানি’ হিসেবে নানা দেশে পড়ে আছে।”

প্রসঙ্গত, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রকাশিত দুর্নীতির শ্বেতপত্র অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে (২০০৯–২০২৩) প্রায় ২৩,৪০০ কোটি মার্কিন ডলার—অর্থাৎ বর্তমান বাজারদরে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা—বিদেশে পাচার হয়েছে। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।

“বর্তমানে ক্রিপ্টোকারেন্সি আকারে টাকা পাচার হচ্ছে। এ বিষয়ে আমাদের প্রশিক্ষণ নেই। সেক্ষেত্রে আমাদের অফিসকে শক্তিশালী করতে হবে। এগুলো প্রতিরোধের পথ বের করতে হবে। কিন্তু সব আমাদের একার পক্ষে সম্ভব নয়,” যোগ করেন ড. মোমেন।

গত ২৪ নভেম্বর হবিগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে দুদকের ১৯২তম গণশুনানিতে দুদক চেয়ারম্যান মোমেন বলেন, “যদি এখানে গণভোট হয়—আমরা দুর্নীতি চাই কি না—তাহলে শতভাগ ভোট পড়বে ‘চাই না’-এর পক্ষে। কিন্তু তারপরও দুর্নীতি হচ্ছে কেন?” পরদিন ঢাকায় জাতীয় নির্বাচনের ব্যাপারে তিনি বলেন, “সুষ্ঠু ও আনন্দময় পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশা করা যায়। তবে কালো টাকার প্রভাব এবারও থাকতে পারে।”

“সংসদ সদস্যদের কাজ আইন প্রণয়ন করা, এটি কোনো লাভজনক পদ নয়। তাই নির্বাচনে অর্থের প্রভাব কমাতে সাংবাদিকদেরও চিন্তা করতে হবে,” মনে করেন দুদক চেয়ারম্যান। প্রার্থীদের সম্পদ বিবরণী দাখিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “যদি প্রার্থীদের সম্পদ আগে দুদকে জমা দিতে বাধ্য করা হয়, তবে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে তা যাচাই করা সম্ভব হবে।”

অর্থনীতিবিদ উপদেষ্টাদের ভাষ্য

আগামী নির্বাচনে ঋণখেলাপিরা অংশ নিতে পারবেন না বলে জানিয়ে ১৩ আগস্ট অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, “নির্বাচন কমিশনের উচিত ঋণখেলাপিদের শনাক্ত করা। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কোর্টের স্টে-অর্ডার নিয়ে। মহিউদ্দিন খান আলমগীর তো ঋণখেলাপি অবস্থায় পাঁচ বছর কাটিয়ে দিয়েছিলেন।” আগামী নির্বাচনে কালো টাকা রোধে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে সচিবালয়ে সেদিন এই অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, “কালো টাকার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় হচ্ছে উৎস আর প্রক্রিয়া। উৎসটা কিন্তু আগের চেয়ে মোটামুটি বন্ধ হয়েছে। আগে তো ব্যাংকের মালিক, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক, সংবাদপত্রের মালিক, ফ্ল্যাটের মালিক—সব একজনই। কিন্তু এখন এটা হচ্ছে না। মোটামুটি এখন একটু চেক অ্যান্ড ব্যালান্স হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা সবসময় বলি অর্থনৈতিক উন্নয়ন নির্ভর করে রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর। রাজনীতিবিদরা যদি উৎসাহ দেন যে টাকা-পয়সা দিয়ে মনোনয়ন দেবেন, ভোট দেবেন, তাহলে আমি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে কিছুই করতে পারব না।”

ডিএসজে আর্কাইভ

সর্বশেষ ৯ ডিসেম্বর দুর্নীতিবিরোধী দিবসের অনুষ্ঠানে বর্তমান সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, “রাজনীতিবিদদের সদিচ্ছা না থাকলে সমাজে পচন ধরবে। রাজনীতিবিদরা ঠিক থাকলে সহজে সমাজে পচন ধরবে না, দুর্নীতি কমে আসবে।” তাঁর মতে, শুধু শাস্তি দিয়েই নয়, সামাজিকভাবে দুর্নীতিবাজদের প্রতিরোধ করলে দুর্নীতি কমে আসবে। দুর্নীতি বন্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

“আগে দুর্নীতিগ্রস্ত লোককে সামাজিকভাবে এড়িয়ে চলা হতো। দুর্নীতিবাজদের খারাপ লোক হিসেবে ঘৃণা করা হতো। মেয়ে বিয়ে দিতে চাইত না; এখন টাকা আছে—লাফিয়ে বিয়ে দিতে যায়, অনুষ্ঠানে সম্মান জানাতে যায়,” বলেন তিনি। শাস্তি দিয়ে দুর্নীতির ক্ষতিপূরণ হয় না উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন বলেন, “এই যে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেল—তাদের শাস্তি কী দেবেন? সারাজীবন জেলে থাকলেও তো শাস্তি হবে না, দেশের ক্ষতি পূরণ হবে না।”

একই সভায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের মহাপরিচালক ড. এ. কে. এনামুল হক বলেন, “শুধু শাস্তি দিয়ে পৃথিবীর কোনো দেশে দুর্নীতি নির্মূল সম্ভব হয়নি। দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা জরুরি।” সভায় বক্তারা আরও বলেন, ভোট হলে যদি শতভাগ লোক দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভোট দেয়—তারপরও দুর্নীতি দূর হবে না।

এর দুই দিন আগে (৭ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) বার্ষিক গবেষণা সম্মেলনে আরেক অর্থনীতিবিদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ বলেন, “অবৈধ সম্পদ উপার্জনে রাজনীতির চাহিদা থাকলে বিধিবিধান দিয়ে কোনো কিছুরই সমাধান হবে না। এক্ষেত্রে একটা অনিয়মের উৎস বন্ধ করলে অন্য উৎস খোঁজা হবে। এজন্য আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত মানসিকতার পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।”

তাঁর মতে, “রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে ন্যায্য ও বৈষম্যহীন অর্থনীতির বিষয় থাকতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিষয়ে বিস্তারিত থাকতে হবে। পৃথিবীর কোনো দেশ এত গরিব নয় যে, সব নাগরিকের কিছু চাহিদা মেটাতে পারবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে প্রয়োজন সদিচ্ছা ও অর্থনৈতিক সঠিক কাঠামো।” পরিকল্পনা উপদেষ্টা আরও বলেন, “ব্যবসায়ী ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে যদি অশুভ আঁতাতের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তাহলে শুধু প্রশাসনিক সংস্কার দিয়ে কিছু হবে না। কর ফাঁকি রোধে অনলাইনে কর দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বড় বড় কর ফাঁকি এই অনলাইন দিয়ে হবে না। এজন্য আরও বড় সংস্কার দরকার।”

ডিএসজে আর্কাইভ

সোচ্চার সব রাজনৈতিক দল

দুর্নীতির লাগাম একমাত্র বিএনপিই টেনে ধরতে পারে—এমন মন্তব্য করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ৭ ডিসেম্বর ঢাকার একটি অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে বলতে পারি—দুর্নীতি রোধ করতে পারলে একমাত্র বিএনপিই তা করতে পারে, কারণ আমরা অতীতে করেছি, ভবিষ্যতেও করতে পারব ইনশাআল্লাহ।” পরদিন (৯ ডিসেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে দুর্নীতি বাংলাদেশের অগ্রগতি ও জনগণের দৈনন্দিন জীবনকে পঙ্গু করে দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমনে বিএনপির সাত দফা পরিকল্পনাও তুলে ধরে তারেক বলেন, “বহু বছরের অব্যবস্থাপনার পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। সৎ নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও জনগণের সমর্থন একসঙ্গে এলে পরিবর্তন অবশ্যই সম্ভব। জনগণ দায়িত্ব দিলে বিএনপি আবারও সেই লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।”

এরই মধ্যে ৮ ডিসেম্বর “সমাজ দেহের ক্যান্সারকে (দুর্নীতি) না বলুন এবং লাল কার্ড প্রদর্শন করুন,” বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, “জাতীয় জীবনের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি নামের মহামারি আমাদের সম্ভাবনাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। জনগণের অধিকার লঙ্ঘন, প্রশাসনের অকার্যকারিতা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুণ্ঠন এবং সামাজিক বৈষম্যের মূল শেকড় এই দুর্নীতি। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স—এটাই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি, সবচেয়ে বড় জনআকাঙ্ক্ষা।”

আরেক ডানপন্থী দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর ও চরমোনাই পীর মাওলানা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম ১০ ডিসেম্বর বিকেলে মোংলার শাপলা চত্বরে এক সমাবেশে বলেছেন, “যারা দেশের টাকা পাচার করে বিদেশে বেগম পাড়া বানায়, দেশকে পাঁচবার দুর্নীতিতে ও চোরের দিক থেকে ফার্স্ট বানায়—তাদের আর ক্ষমতায় আনা যাবে না।”

বামপন্থী সংগঠন গণসংহতি আন্দোলন ৯ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন ডেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ১১ দফা প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেছেন, “রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণের হাতিয়ার বানিয়ে দুর্নীতিকে নীতিতে পরিণত করা হয়েছে, যার সবচেয়ে গভীর বিস্তার ঘটেছে বিগত সরকারের সময়ে।”

“শেখ হাসিনার আমলে দুর্নীতির ধরন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে, যেখানে রাষ্ট্র নিজেই দুর্নীতির ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করেছে,” উল্লেখ করে জোনায়েদ সাকি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল লুণ্ঠিত অর্থ ফেরত এবং জড়িতদের বিচার হবে, কিন্তু বাস্তবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।”

ডিএসজে আর্কাইভ

সংস্কারের যত সুপারিশ

বাংলাদেশের নির্বাচন সংস্কার কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ কঠোর নিয়ম প্রস্তাব করেছে। দলীয় অর্থায়নের উৎস প্রকাশ থেকে শুরু করে বিদেশি অর্থ গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা—সবকিছুই এসেছে দুর্নীতি ও কালো টাকা ঠেকানোর লক্ষ্য নিয়ে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে ১৫ জানুয়ারি দেড়শ সুপারিশ-সমৃদ্ধ প্রতিবেদন জমা দেয় এই কমিশন।

তাদের সুপারিশ অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতি বছর নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দিতে হবে। চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট দ্বারা নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে—যাতে দলীয় আয়-ব্যয়ের প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে আসে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিদেশি অর্থায়ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। কোনো দল বিদেশি দাতা বা সংস্থার কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করলে তা বেআইনি হিসেবে গণ্য হবে। দলীয় ব্যয় নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখতে হবে এবং তা প্রকাশ করতে হবে। কমিশন মনে করছে, এতে কালো টাকা রাজনীতিতে প্রবেশের পথ রুদ্ধ হবে। এই নিয়মগুলো কার্যকর হলে ভোটাররা জানতে পারবেন কোন দল কীভাবে অর্থ ব্যবহার করছে। কমিশনের ভাষায়, “আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।”

ঢাকায় ১১ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে সেই নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “ক্ষমতার পালাবদল যেন দুর্নীতির পালাবদল না হয়—সেটি নিশ্চিত করতে হবে। দেশে গণতন্ত্রের সুরক্ষায় সুষ্ঠু নির্বাচনের পাশাপাশি নির্বাচিত সরকারকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও দেশের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।”

“নির্বাচন ও রাজনৈতিক দল থেকে দুর্বৃত্তায়ন দূর করতে হবে,” উল্লেখ করে জানুয়ারিতেই তিনি বলেছিলেন, দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত না হলে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করা যাবে—সে আশা করাও দুরাশা। রাজনৈতিক দলগুলোকে গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনার বিষয়ে তিনি বলেন, “দায়বদ্ধতার বিধান অন্তর্ভুক্ত করেছি। এটা চারটিখানি কথা নয়। এটা বলা সহজ; কিন্তু এটা আমাদের করতে হবে।” নির্বাচন ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করতেই সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নয়; নির্বাচনী অঙ্গনকে দুর্নীতিমুক্ত করতেই নির্বাচন ব্যবস্থায় সংস্কার প্রস্তাব করা হয়েছে।”

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ভোটের কথা উল্লেখ করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “তিনটি নির্বাচনে যারা নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাসনে ফেলে দিয়েছে—কর্মকর্তা শুধু নয়, আমাদের কমিশন সদস্যরা; তাদের ব্যাপারে তদন্ত করা, বিশেষত ২০১৮ সালের মধ্যরাতে অভূতপূর্ব কাণ্ড ঘটেছে—সে ব্যাপারে তদন্ত করে তাদের বিচারের আওতায় ও দায়বদ্ধতার আওতায় আনা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।”

ডিএসজে আর্কাইভ

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বিএনপিসহ বেশির ভাগ দলের বর্জনের মধ্য দিয়ে টানা চতুর্থবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। প্রবল আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। তার আগে ২০১৪ সাল থেকে আওয়ামী লীগের আমলে অনুষ্ঠিত তিনটি নির্বাচন ব্যাপক সমালোচিত হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অভিযোগ ওঠে। বিতর্কিত ওই তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে ওঠা অভিযোগ তদন্তেও সরকার একটি কমিশন গঠন করেছে গত ২৬ জুন।

এ ছাড়া ১৫ জানুয়ারির প্রধান উপদেষ্টার হাতে তুলে দেওয়া দুদক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে বেশ কয়েকটি কাঠামোগত সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুদকের নিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও আমলানির্ভর প্রভাব দূর করতে স্বচ্ছ ও বহুমাত্রিক প্রতিনিধি-ভিত্তিক নিয়োগপ্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে।

কমিশন আরও উল্লেখ করে, রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক স্বার্থ ও প্রভাব-সংঘাত রোধে পৃথক আইন প্রণয়ন জরুরি, পাশাপাশি সম্পদ ঘোষণার উৎস-ট্রেসিং বাধ্যতামূলক করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি খাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি খাতের ঘুষকে অপরাধ ঘোষণা, কালো আয় বৈধকরণের সমস্ত সুযোগ বাতিল এবং বড় রাজনৈতিক বা উন্নয়ন প্রকল্পে অডিট রিপোর্ট পাওয়া মাত্র দুদকের মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত শুরু করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।

কমিশন মন্তব্য করে, নাগরিক–রাষ্ট্র সংযোগস্থলে রাজনৈতিক তদবির ও প্রভাব খাটার সুযোগ কমাতে ভূমি, স্বাস্থ্য, রাজস্ব, পাসপোর্টসহ সব সেবাখাতে পূর্ণ ‘এন্ড-টু-এন্ড’ অটোমেশন চালু করা জরুরি—যাতে ব্যয়, লেনদেন ও সেবাদান প্রক্রিয়া ডিজিটালি পর্যবেক্ষণযোগ্য হয়। এ ছাড়া প্রতিবেদনে এমন ইঙ্গিত রয়েছে যে, রাজনৈতিক দল ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পদ ঘোষণায় স্বচ্ছতা এবং নির্বাচন বা মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় দুর্নীতিবাজদের প্রবেশ রোধে আইনি কাঠামো শক্তিশালী না হলে সামগ্রিক দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থার কার্যকারিতা সীমিত থাকবে।

বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশন তাদের সুপারিশমালা ১৫ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেয়। প্রতিবেদনে রাজনীতি ও নির্বাচন প্রসঙ্গে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রাখা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—দুদককে রাজনৈতিক প্রভাব ও আমলানির্ভরতা থেকে মুক্ত করা, নির্বাচনী অর্থায়নে কালো টাকা প্রতিরোধে উৎস প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, ঘুষ ও অবৈধ লেনদেনকে বেআইনি ঘোষণা করা, এবং সেবামূলক খাতকে অটোমেশনের আওতায় এনে ব্যয় ও লেনদেন স্বচ্ছ করা। দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দীর্ঘদিন থেকেই এসব ইস্যুতে সোচ্চার ছিলেন।

টিআইবির বিশদ সুপারিশ

সর্বশেষ ৭ ডিসেম্বর টিআইবির এক সংবাদ সম্মেলনে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে রাজনৈতিক দলগুলোর পরিকল্পনায় জনস্বার্থের অবস্থান কোথায় এবং কীভাবে তারা জনস্বার্থ সংরক্ষণ ও বিকশিত করে পরিকল্পনা বা কৌশল প্রণয়ন করবে—তা উল্লেখ নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।”

রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে মোট ৫২টি সুপারিশ উপস্থাপন করেছে তারা। সুপারিশমালায় দলগুলোর স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং দুর্নীতি ও বৈষম্যমুক্ত উন্নয়ন কৌশল গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করা হয়েছে, এবং সকল সরকারি ক্রয়, উন্নয়ন প্রকল্পে ‘ভ্যালু ফর মানি’ নিশ্চিত করতে আইনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কৌশলপত্রে রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবিরোধী দায়িত্ব ও কর্তব্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে তাদের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পাশাপাশি জনপ্রতিনিধিত্ব ও সরকারি কার্যক্রমে ব্যক্তিস্বার্থ, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে “স্বার্থের দ্বন্দ্ব আইন” প্রণয়নের সুপারিশ করেছে টিআইবি।

ডিএসজে আর্কাইভ

ঢাকা সফরকালে ৪ সেপ্টেম্বর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) চেয়ারম্যান ফ্রাঁসোয়া ভ্যালেরিয়াঁ বলেছিলেন, “বিশ্বব্যাপী কর্তৃত্ববাদের উত্থানের স্রোতের বিপরীতে অভূতপূর্ব ত্যাগের বিনিময়ে কর্তৃত্ববাদের পতন ঘটিয়ে যে স্বপ্ন নিয়ে নতুন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হয়েছে, সেই স্বপ্নপূরণের জন্য সংস্কারের ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখা জরুরি। কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পরও দুর্নীতি বিদ্যমান আছে; তাই এর বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে।”

বৈশ্বিকভাবে দুর্নীতির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনিও বলেন, “কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পাচার হয়েছে। বিভিন্ন স্তরের ক্ষমতাশালীরা এই অর্থ পাচারে জড়িত ছিল; এই অর্থ পাচার ‘দুর্নীতির বৈশ্বিক অর্থনীতি’ বেগবান করেছে।”

“যদি এ অর্থ চুরি না হতো, তাহলে বাংলাদেশের জিডিপি আরও বেশি হতো এবং তা ন্যায়সংগতভাবে জনকল্যাণে ব্যবহার করা যেত। এ অর্থ দারিদ্র্য হ্রাসেও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হতো,” যোগ করেন তিনি। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ভ্যালেরিয়াঁ বলেছিলেন, “আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের পর যে সরকার আসবে, টিআইবির ওয়াচডগ ভূমিকার কারণে তারাও অস্বস্তিতে পড়তে পারে।”

Share this article

আপনারা চাইলে কাস্টম বিজ্ঞাপন এইখানে দিতে পারেন
বিজ্ঞাপনের ছবি বা ভিডিও সাইজ ৩৩৬x২৮০ পিক্সাল হতে হবে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top